রাবি ‘দুর্নীতি বিরোধী শিক্ষকবৃন্দ’ র আহ্বায়ক ড. সুলতান-উল-টিপু’র বিপক্ষেই গুরুতর অভিযোগ

Chapai Chapai

Tribune

প্রকাশিত: ৮:১৭ অপরাহ্ণ, জুলাই ১০, ২০২১

বিশেষ প্রতিনিধি: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় “দুর্নীতি বিরোধী শিক্ষকবৃন্দ’র আহবায়ক ও ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের সভাপতি প্রফেসর সুলতান-উল-ইসলাম টিপু নিজেই নানান বিতর্কে জড়িত। শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতি ফলক নির্মাণে জাতিরপিতাকে অবমাননা ও দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত। এছাড়াও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনিস্টিউটের পরিচালক হিসেবে যোগদানের পর সেখানেও বিতর্কিত হয়েছেন তিনি।

    শুধু তাই নয় বিভিন্ন সুত্রমতে ও তার জীবনবৃত্তান্ত দেখে নিশ্চিত হওয়া গেছে তার আপন বড়ভাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় দর্শন বিভাগের প্রফেসর ড. সোলায়মান আলী সরকার। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান সরকারের আশীর্বাদ পুষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টরের দায়িত্ব পালন করেন ১৯৭১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারী থেকে ২৮ নভেম্বর পর্যন্ত।

সেই সময়ের রাবি উপাচার্য ড. আব্দুল বারী ও রেজিষ্টার আব্দুর রহিম জোয়ার্দারকে মুক্তিযুদ্ধ শেষে পাকিস্তানীদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও দালাল অভিযোগে বাধ্যতামুলক অবসরে পাঠায় বঙ্গবন্ধু সরকার। সেই সাথে রাবির বাংলা বিভাগের তিন শিক্ষক কেও শাস্তি দেওয়া হয়। একই সাথে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ‘দালালী’ এর অভিযোগে ছয় শিক্ষক কে গ্রেফতার করা হয়।

    (সূত্র:”একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায় ” বইয়ের ১৯৫ পৃষ্ঠা)।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা ও ধর্ষণে পাকিস্তানের সহযোগী ভিসি ড. আব্দুল বারীর প্রশাসনে ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর ড. সোলায়মান আলী সরকার জামাতপন্থী হিসেবে পরিচিত ছিলেন বলে স্থানীয় ও রাবির সিনিয়র শিক্ষকরা জানিয়েছেন। তার বাড়িতে থেকেই ড. সুলতান উল ইসলাম টিপু পড়াশোনা করেন। ড. সোলায়মানের বিনোদপুরের বাড়িতে জামাত শিবিরের নিয়মিত মিটিং হয় বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ দীর্ঘদিনের। তার ছেলে শওকত আরিফ পুঠিয়া ইসলামিয়া মহিলা কলেজের শিক্ষক। জামায়াতের রুকন সদস্য। জামাই ডা: মহিউদ্দিন প্রত্যক্ষভাবে জামায়াতের রাজনীতির সাথে যুক্ত।

এ বিষয়ে রাবির একজন সিনিয়র অধ্যাপক জানান, যে সময়ে সারাদেশ পাক হানাদারদের কাছে অবরুদ্ধ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষক মীর আব্দুল কাইউম, সুখরঞ্জন সমাদ্দার, হবিবুর রহমান কে পাক হানাদার বাহিনী ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে। শহীদ শামসুজ্জোহা হলকে পাক হানাদার বাহিনী মিনি ক্যান্টনমেন্ট বানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়সহ আশেপাশের এলাকার প্রায় চার হাজার মানুষকে হত্যা করে হলের পাশেই লাশ ফেলে রাখে। সেই সময়ে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের কেউ প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকতে পারতেন না। সেসময় মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের কোন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের রাবিতে অবস্থান করা সম্ভব ছিলো না। তাছাড়া তখন মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করতে ট্রেনিং এর জন্য শিক্ষক শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের বাইরে চলে যায়। সেই সময় ক্যাম্পাসে শুধু পাকিস্তানের সহযোগীরা ই নির্বিঘ্নে থাকতে পেরেছে। সেই মহূর্তে যিনি রাবি প্রশাসনে প্রক্টরের দায়িত্ব পালন করেছেন নিশ্চয় তিনি মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সৈনিক ছিলেন না।

সেই সিনিয়র শিক্ষক আরো বলেন, যার আপন বড়ভাই রাবিতে মুক্তিযুদ্ধের সময় খুন-ধর্ষণ- নির্যাতনের সময় প্রক্টরের দায়িত্ব পালন করেন তিনি কিভাবে প্রগতিশীল শিক্ষকদের নেতা হন???

    মোঃ এনামুল হক রচিত “রাজশাহীতে মুক্তিযুদ্ধ” গ্রন্থে স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন, উপাচার্য ড. আব্দুল বারীর অধীনেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে খুন-ধর্ষণ-নির্যাতন সংঘটিত হয়েছে। রাজশাহীতে ১৯৭১ সালে রাবির ভিসি ছিলেন প্রফেসর আব্দুল বারী। যিনি সরাসরি পাকিস্তানিদের আস্থাভাজন ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় রাবিতে গণহত্যার পুরস্কার স্বরূপ ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমান তাকে পুনরায় রাবির ভিসি বানায় পরে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যানও করা হয়।

তথ্য মতে, ১৯৬৪ সালে প্রভাষক হিসেবে দর্শন বিভাগে যোগদান করেন ড. সোলায়মান আলী সরকার। পাকিস্তানি হানাদার গোষ্ঠীর সহযোগী দালাল হিসেবে স্বীকৃত তৎকালীন ভিসি সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন ও তারপরের ভিসি ড. আব্দুল বারীর অত্যন্ত বিশ্বস্ত ছিলেন তিনি।

প্রতিবেদকের হাতে ড. সুলতান উল ইসলাম টিপু’র যে বায়োডাটা এসেছে, সেখানে ড. সোলায়মান আলী সরকার কে আপন ভাই হিসেবে মুক্তিযুদ্ধকালীন সক্রিয় সৈনিক হিসেবে দাবি করেছেন। যদিও তিনি সেখানে তার বড় ভাই ১৯৭১ সালে ভারপ্রাপ্ত প্রক্টরের দায়িত্ব পালন করেছেন সেটা উল্লেখ করেন নি।

শুধু তাই নয় তিনি তাঁর বায়োডাটায় শিক্ষকতা জীবন নিয়েও তথ্যে গোপন করেছেন। তিনি ১৯৯৫ সালে উপাচার্য জামাতপন্থী অধ্যাপক ইউসুফ আলীর সময়ে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্ত হলেও তা উল্লেখ করেননি।

সরকারের বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ করা বায়োডাটায় এমন তথ্য গোপন করাকে একজন শিক্ষকের নৈতিক স্খলনের পরিচয় ফুটে উঠেছে বলে মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজ।

ড. সুলতান উল ইসলাম টিপুকে ফোন দিয়ে জানতে চাওয়া হয় যে, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় রাবিতে প্রক্টরের দায়িত্ব পালনকারী ড. সোলায়মান আলী সরকার আপনার আপন বড়ভাই? তিনি কোন হ্যাঁ- না কিছু উত্তর না দিয়ে সরাসরি এসে কথা বলতে বলেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সাবেক আহ্বায়ক মতিউর রহমান মর্তুজা বলেন, ‘একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রক্টর হলেন সেই ক্যাম্পাসের সকলের নিরাপত্তাদাতা। ১৯৭১ সালে রাবি জোহা হলে যে গণহত্যা ও ধর্ষণ হয়েছিলো তা তৎকালীন ভিসি ড. আব্দুল বারী প্রত্যক্ষ সহযোগিতায়। সেই প্রশাসনে দায়িত্ব পালন করা সকলেই দায়ী। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের ঘোষণা অনুযায়ী দেশব্যাপী রাজাকারের নতুন তালিকার কথা বলা হয়েছে। আমরা চাই মুক্তিযুদ্ধের সময়ে রাবিতে কার কি ভুমিকা ছিলো তা নিরপেক্ষ তদন্ত করে সহযোগীদের নাম প্রকাশ করে সত্য ইতিহাস তুলে ধরা হোক পরবর্তী প্রজন্মের জন্য। ‘

এছাড়াও রাবিতে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতি ফলক নির্মাণে জাতিরপিতাকে অবমাননা ও নির্মাণ কাজে দুর্নীতির অভিযোগ এসেছে নির্মাণ কাজের সমন্বয়ক ও রাবি প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের একাংশের নেতা ড. সুলতান উল ইসলাম টিপু র বিরুদ্ধে।

২০১৪ সালের ২৯ অক্টোবর সিন্ডিকেট সভায় রাবির তিন শহীদ বুদ্ধিজীবী মীর আব্দুল কাইয়ুম, সুখরঞ্জন সমাদ্দার ও হবিবুর রহমান এর প্রতিকৃতি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই নির্মাণ কাজে প্রধান সমন্বয়ক হন তিনি। স্মৃতি ফলকে তিন শহীদ বুদ্ধিজীবীর প্রতিকৃতি উপরে করে জাতিরপিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিকে নীচে করা হয়৷ যা দৃষ্টিকটু দেখায়। এর পর থেকেই ঐ স্মৃতি ফলক নির্মাণের সমালোচনা শুরু করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শিক্ষার্থী সহ বিভিন্ন সামাজিক রাজনৈতিক সংগঠন।

বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি নীচে দিয়ে বানানো সেই শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিফলক

সমালোচনা শুরুর পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তৎকালীন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের আহবায়ক ড. এম মজিবুর রহমানের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠিত করে। তদন্ত কমিটি তাদের তদন্তে আরো গুরুতর তথ্য পান।

স্মৃতি ফলকে ১৪০০ কেজি তামা ব্যবহার করার কথা থাকলেও ব্যবহার হয়েছে মাত্র ৪৯২ কেজি। এই স্মৃতি ফলক নির্মাণ কাজের জন্য বরাদ্দ ৭৬ লাখ ৪৮ হাজার ৪১৫ টাকা আগেই তুলে নেন নির্মাণ কমিটির আহবায়ক ড. সুলতান উল ইসলাম টিপু। তদন্ত কমিটির কাছে তিনি কোন ভাউচারও দেখাতে পারেননি। নিজ ইচ্ছেমতো টাকা খরচ করেছেন।

সেই তদন্ত কমিটি এই অনিয়মের আইনগত শাস্তি ও ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন আর্থিক কাজে তাকে সম্পৃক্ত না করার সুপারিশ করেন।

তিনি নিজে রাবি দুর্নীতি বিরোধী শিক্ষকবৃন্দের আহবায়ক হিসেবে পরিচয় দেন অথচ তিনি নিজেই দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত ।

শুধু এখানেই নয় তিনি পরিবেশ বিজ্ঞান ইনিস্টিউটের পরিচালক সেখানে আর্থিক অস্বচ্ছতার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। পরিবেশ বিজ্ঞান ইনিস্টিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. এস এম শফিউজ্জামান এর সোসাল মিডিয়ায় একাধিক স্টাটাস লক্ষ্য করা গেছে। কখনও তিনি ড. সুলতান-উল-ইসলাম টিপু’র আর্থিক অস্বচ্ছতার কথা তুলে ধরেছেন, কোন স্টাটাসে তিনি তার নীতি নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

৩১ জানুয়ারি ২০২০ সালে ড. এস এম শফিউজ্জামান তাঁর স্টাটাসে ড. সুলতান উল ইসলাম টিপু কে উদ্দেশ্য করে লেখেন,

“আমার ইনস্টিটিউটের আমি সহ তিনজন শিক্ষকের (৪ জনের মধ্যে)পত্র,- যা অভিযুক্ত প্রফেসরের কাছে প্রেরিত হয়। IQAC প্রজেক্টের অর্থ প্রতারনার আশ্রয় নেওয়ায় আমরা উনাকে এই পত্রগুলো দিতে বাধ্য হই। আমি অনুরোধ করব আমার ইতিপূর্বে লেখার সাথে এই চিঠিতে উল্লেখিত অভিযোগ ভালভাবে মিলিয়ে দেখার জন্য। তাহলেই বুঝবেন একজন উচ্চ শিক্ষিত মানুষের বিবেক কতটা অন্ধ হতে পারে শুধুমাত্র ক-টা টাকার জন্য! (যারা মনে করেন আমি প্রশাসনের দালালি করছি- তারা ২১ মে ২০১৯ তারিখে আমার ফেসবুকে দেওয়া পোস্টটি পড়ুন। তবে এটা সত্য যে শহীদ বুদ্ধিজীবী ভাষ্কর্য দূর্নীতির রিপোর্ট প্রকাশের সময় আমার লেখাগুলো প্রকাশ করেছি। আমার অভিযোগগুলো শুধুমাত্র আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে- নির্দিষ্ট একজন ব্যাক্তির অপকর্মের বিরুদ্ধে,- কোন দল বা গোষ্ঠির বিরুদ্ধে নয়)।”

রাবির শিক্ষক সমাজ মনে করেন, সবার উচিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলা। কিন্তু নিজে দুর্নীতি ও বিতর্ক মুক্ত থাকাটা আগে জরুরি। শুধু বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করা শিক্ষক সমাজে মানায় না।

পোস্টটি শেয়ার করুন